বিশেষ প্রতিনিধি ::
সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ে প্রেষণে কর্মরত এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ বিক্রি, নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মাওলানা শোয়েব আহমদ সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয় সংলগ্ন মসজিদের ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার মূল পদ ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট/অফিস সহায়ক এবং তিনি গোলাপগঞ্জ পাবলিক হেলথ থেকে প্রেষণে সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কর্মরত বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন সিলেট সিটি মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের কথিত আত্মীয় এবং হেলথ স্টোর কিপার মনজুর আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে শোয়েব আহমদ কার্যালয় ও এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। তার সঙ্গে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং তৎকালীন সময়ে তিনি কী ধরনের প্রভাব খাটিয়েছেন, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
করোনা ও সরকারি ওষুধ নিয়ে অভিযোগ
করোনা মহামারির সময় বিদেশগামী যাত্রীদের ভ্যাকসিনের সিরিয়াল করে দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শোয়েব আহমদের বিরুদ্ধে।
এছাড়া সরকারি ওষুধ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বাইরে বিক্রির অভিযোগও করেছেন কয়েকজন। অভিযোগকারীদের দাবি, ‘সাজিদ’ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে এসব সামগ্রী বিক্রি করা হতো। সরকারি ওষুধের মজুত, বিতরণ ও হিসাবের নথি যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব বলে তারা মনে করছেন।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ
চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার একাধিক অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘হোসাইন’ নামে এক ব্যক্তিকে ওয়ার্ড বয় পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া ২০২১ সালের দিকে ‘আতিক’ নামে এক ব্যক্তিকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে নির্ধারিত ৭০ হাজার টাকার পরিবর্তে ২ লাখ ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের দিকে এ বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশের কথাও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ হাসপাতালের মাধ্যমে এক নিকটাত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নিয়েও শোয়েব আহমদের সঙ্গে কয়েকজনের বিরোধ চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক ভিসি মোরশেদ চৌধুরীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মাছের প্রকল্পের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
ফিশারি প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের একজন নজরুল ইসলামের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়া হলেও বাকি অর্থ এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা ও অন্যান্য আর্থিক নথি যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
মানবপাচার ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ
চৌহাট্টার একটি ফার্মেসির সামনে চা-পাতা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ‘সেবুল’ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে শোয়েব আহমদের ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করে মানবপাচার বা ‘আদম ব্যবসা’র সঙ্গেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অর্থ লেনদেনের পর সেবুল বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া ২০১১-১২ সালের দিকে নিজ এলাকার ওবায়দুল্লাহ বাবুলের তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় শোয়েব আহমদের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো মামলা, আদালতের নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ
নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ‘পাবেল’ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, ফোনকলের তথ্য ও অন্যান্য নথি যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।
মোবাইল যোগাযোগ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, বিগত সরকারের সময়ে শোয়েব আহমদ কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং কী ধরনের কর্মকাণ্ডে ওই যোগাযোগ ব্যবহৃত হয়েছে, তা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন, নিয়োগ, সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো আলাদাভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য বা মোবাইল ফোনের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে না দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হোক। সরকারি ওষুধের মজুত ও বিতরণ রেজিস্টার, নিয়োগ সংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেন, অভিযোগ-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগকারীরা শোয়েব আহমদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


















